ঘুমানোর আগে সুন্নত আমল, দোয়া ও ঘুমের আদব

ঘুমানোর আগে সুন্নত আমল, দোয়া ও ঘুমের আদব মেনে চলা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রসূলুল্লহ(স) ঘুমানোর আগে যেসব আমল ও দোয়া করেছেন, সেগুলো অনুসরণ করলে রাতের বিশ্রামের সময়ও সুন্নতের ওপর আমল করা সম্ভব।

ঘুমানোর-আগে-সুন্নত-আমল-দোয়া-ও-ঘুমের-আদব

ঘুম শুধু শরীরের বিশ্রামের জন্য নয়, বরং দিনের ব্যস্ততা শেষে নিজেকে আল্লাহর স্মরণে ফিরিয়ে নেওয়ারও একটি সুন্দর সুযোগ। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে অজু করা, আয়াতুল কুরসি ও বিভিন্ন দোয়া পড়া এবং ডান কাতে শোয়ার মতো সুন্নত আমলগুলো সম্পর্কে জানা ও পালন করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য উপকারী।

সূচিপত্রঃ ঘুমানোর আগে সুন্নত আমল, দোয়া ও ঘুমের আদব 

ঘুমানোর আগে সুন্নত আমল এর গুরুত্ব

ঘুমানোর আগে সুন্নত আমলের গুরুত্ব একজন মুসলিমের জন্য অনেক বেশি কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘুমানোর আগে কিছু নির্দিষ্ট আমল ও আদব অনুসরণ করতেন এবং সাহাবীদেরকেও সেগুলো শিক্ষা দিয়েছেন। ঘুম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন হলেও একজন মুমিন চাইলে এই বিশ্রামের সময়টিকেও ইবাদতের মাধ্যমে অর্থবহ করে তুলতে পারেন। অজু করে ঘুমানো, আল্লাহকে স্মরণ করা, দোয়া পড়া এবং আমল গুলো রাসুলুল্লাহ (স) এর সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত।

ঘুমানোর আগে সুন্নত আমল করার মাধ্যমে একজন মুসলিম দিনের শেষ সময়টুকু আল্লাহর স্মরণে কাটানোর সুযোগ পান। সারাদিনের ব্যস্ততা ও বিভিন্ন কাজের পর ঘুমাতে যাওয়ার আগে দোয়া, জিকির ও কোরআনের আয়াত পাঠ করলে মনকে প্রশান্ত করার পাশাপাশি আল্লাহর উপর ভরসা করার অনুভূতি ও তৈরি হয়। বিশেষ করে আয়াতুল কুরসি, তিন কুল এবং ঘুমের দোয়া পড়ার মতো আমলগুলো রাসুলুল্লাহ (স)  এর নির্দেশনা ও আমল থেকে প্রমাণিত।
তাই ঘুমানোর আগে সুন্নত আমলকে শুধু ঘুমের প্রস্তুতি হিসেবে না দেখে একজন মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। নিয়মিতভাবে এসব সুন্নত পালনের অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও আল্লাহর স্মরণে থাকা সম্ভব হয় এবং রাসূলুল্লাহ (স)  এর সুন্নত অনুসরণের সুযোগ পাওয়া যায়। পরবর্তী অংশগুলোতে ঘুমানোর আগে ওযু করা, বিছানায় ঝেরে নেওয়া, আয়াতুল কুরসী ও তিন কুল পাঠ, ঘুমের দোয়া এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।

ঘুমানোর আগে ওযু করে নেওয়া

ঘুমানোর আগে অজু করে নেওয়া রাসুলুল্লাহ (স) এর শিখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। হযরত আল বারা ইবনে রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত নবী (স) বলেছেন, যখন তুমি তোমার বিছানায় যেতে চাও তখন নামাজের ওজুর মতো অজু করে ডান কাতে শুয়ে পড়বে। এরপর একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়ার নির্দেশনাও তিনি দিয়েছেন। (সহীহ বুখারীঃ২৪৭; সহীহ মুসলিমঃ২৭১০)

ওযু করে ঘুমাতে যাওয়ার মাধ্যমে একজন মুসলিম পবিত্র অবস্থায় রাত কাটানোর চেষ্টা করেন এবং ঘুমানোর আগের সময়টুকু আল্লাহর স্মরণে শুরু করতে পারেন। বিশেষ করে দিনের ব্যস্ততা শেষে ওযু করার অভ্যাস শরীর ও মনকে ঘুমের প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। তবে অজু করে ঘুমানো কে এমন ভাবে বলা উচিত নয় যে এটি না করলে ঘুমানো যাবে না। বরং এটি একটি সুন্নত ও উত্তম আমল হিসেবে পালন করা উচিত।
তাই প্রতিদিন ঘুমানোর আগে সম্ভব হলে নতুন করে ওযু করে নেওয়ার অভ্যাস করা ভালো। অজু করার পর ডান কাতে শুয়ে ঘুমের দোয়া পড়লে একই সঙ্গে একাধিক সুন্নত আমল পালন করা হয়। কিভাবে রাতের বিশ্রাম শুরু করা একজন মুসলিমের জন্য সুন্দর ও বরকতময় অভ্যাস হতে পারে।

বিছানা ঝেড়ে পরিষ্কার করে নেওয়া

ঘুমানোর আগে বিছানা ছেড়ে পরিষ্কার করে নেওয়া রাসূলুল্লাহ (স) এর শেখানো গুরুত্বপূর্ণ আদবগুলোর একটি। হযরত আবু হুরায়রা(রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স)  বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন বিছানায় যাবে সে যেন নিজের কাপড়ের ভেতরের অংশ দিয়ে বিছানাটি ঝেড়ে নেয় কারণ সে জানে না তার অনুপস্থিতিতে বিছানায় কি এসে পড়েছে। (সহীহ বুখারী:৬৩২০; সহীহ মুসলিম:২৭১৪)

এই আমলের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও সতর্কতার একটি সুন্দর শিক্ষা রয়েছে। দিনের বেলায় বিছানায় ধুলাবালি, ছোট কোন পোকামাকড় বা অন্য কোন ক্ষতিকর বস্তু এসে থাকতে পারে যা আমরা খালি চোখে সব সময় বুঝতে পারিনা। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে বিছানাটি ভালোভাবে দেখে ও ঝেড়ে নেওয়া শুধু সুন্নতের অনুসরণই নয় বরং নিজের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার দিক থেকেও একটি ভালো অভ্যাস।
বিছানা ঝাড়ার সময় অবশ্যই সতর্কভাবে কাজ করা উচিত, যাতে কোন ক্ষতিকর পোকামাকড় থাকলে তা শরীরে বা হাতে না লাগে। পাশাপাশি নিয়মিত বিছানার চাদর, বালিশের কভার ও কম্বল পরিষ্কার রাখাও জরুরি। এভাবে ঘুমানোর আগে বিছানা প্রস্তুত করে নিলে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়া যায় এবং রাসূলুল্লাহ(স.) এর শিখানো এই সুন্দর সুন্নতটিও পালন করা হয়।

আয়াতুল কুরসি পাঠ করা

আয়াতুল কুরসি পাঠ করা ঘুমানোর আগে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। আয়াতুল কুরসি হলো সূরা আল বাকারার ২৫৫ নাম্বার আয়াত যেখানে আল্লাহতালার মহত্ব, ক্ষমতা, জ্ঞান ও সার্বভৌমত্বের বর্ণনা রয়েছে। ঘুমানোর আগে এটি পাঠ করার ব্যাপারে সহি হাদিসের বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) এর বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি রাতে ঘুমানোর সময় আয়াতুল কুরসি পাঠ করে আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য একজন রক্ষাকারী থাকে এবং সকাল পর্যন্ত শয়তান তার কাছে আসতে পারে না। (সহীহ বুখারী:২৩১১)

তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করার অভ্যাস একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত সুন্দর একটি আমল হতে পারে। দিনের ব্যস্ততা শেষ করে আল্লাহর কালাম পাঠ করার মাধ্যমে রাতের শেষ সময়টুকু আল্লাহর স্মরণে কাটানো যায়। তবে এই আমলকে কোন কুসংস্কার বা যান্ত্রিক অভ্যাস হিসেবে না দেখে আল্লাহর উপর বিশ্বাস, তাঁর ক্ষমতা ও হেফাজতের প্রতি পূর্ণ আস্থার সঙ্গে পালন করা উচিত।

ঘুমানোর-আগে-সুন্নত-আমল-দোয়া-ও-ঘুমের-আদব


আয়াতুল কুরসি পাঠ করার সময় এর অর্থ ও বক্তব্য বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে আল্লাহ তাআলার জীবিত ও চিরস্থায়ী সত্তা, তাঁর জ্ঞান এবং আসমান জমিনের উপর তাঁর পূর্ণ কর্তৃত্বের বিষয়টি স্মরণ করা হয়। তাই ঘুমানোর আগে অজু করে শান্তভাবে আয়তন করছি পাঠ করে এবং এরপর ঘুমের দোয়া পড়ে শুয়ে পড়া একজন মুসলিমের জন্য সুন্দর একটি রাতের আমল হতে পারে। 

তিন কুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া

ঘুমানোর আগে তিন কুল পড়ে শরীরে ফুঁ দেওয়া রাসূলুল্লাহ (স.) এর আমল গুলোর মধ্যে অন্যতম। তিন কুল বলতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাসকে বোঝানো হয়। হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) প্রতিরাতে যখন বিছানায় যেতেন তখন দুই হাত একত্র করে তাতে ফুঁ দিতেন এবং সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করতেন। (সহীহ বুখারী:৫০১৭)

এই আমলের মাধ্যমে একজন মুসলিম ঘুমানোর আগে আল্লাহ তায়ালার কাছে আশ্রয় ও নিরাপত্তা কামনা করতে পারেন। সুরা ইখলাসে আল্লাহর একত্ব ও মুহূর্তের ঘোষণা রয়েছে, সূরা ফালাকে এবং সূরা নাসে বিভিন্ন ধরনের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। তাই ঘুমানোর আগে মনোযোগের সঙ্গে এসব সুরা পাঠ করা আল্লাহ তাআলার স্মরণে রাত শুরু করার একটি সুন্দর উপায়।
দুই হাতের তালুতে হালকা ফুঁ দিয়ে শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী হাত বুলিয়ে নেওয়া সুন্নত পদ্ধতি। নিয়মিত এই আমল করার অভ্যাস গড়ে তুললে ঘুমানোর আগের সময়টুকু আল্লাহর স্মরণ ও তার ওপর ভরসার মাধ্যমে কাটানো যায়। পাশাপাশি সূরা গুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করলে শুধু মুখস্ত পাঠের পরিবর্তে এর শিক্ষা ও বার্তা ও হৃদয়ে ধারণ করা সহজ হয়।

ঘুমানোর দোয়া পাঠ করা

ঘুমানোর দোয়া পাঠ করা ঘুমাতে যাওয়ার আগে একজন মুসলিমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত আমল। রাসুলুল্লাহ (স.)  ঘুমানোর সময় আল্লাহর নাম স্মরণ করতেন এবং বিভিন্ন দোয়া পাঠ করতেন। হযরত হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স.) যখন বিছানায় যেতেন তখন বলতেন, "আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমূতু ওয়া আহইয়া" অর্থাৎ "হে আল্লাহ আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি এবং আপনার নামেই জীবিত হই।" (সহীহ বুখারী:৬৩১২)

এই ছোট দোয়াটির মধ্যে একজন বান্দা আর আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার সুন্দর প্রকাশ রয়েছে। ঘুম মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাভাবিক অবস্থা; তাই ঘুমানোর আগে আল্লাহর নাম স্মরণ করে তার ওপর ভরসা করা একজন মুসলিমের জন্য প্রশান্তি দায়ক আমল হতে পারে। দিনের সব ব্যস্ততা শেষ করে এই দোয়া পড়ার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে রাতের বিশ্রামে যাওয়া যায়।
তাই প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে দোয়াটি মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস করা ভালো। শুধু মুখস্থ ভাবে পড়ার পাশাপাশি এর অর্থ মনে রাখলে দোয়াটির তাৎপর্য আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। চাইলে ঘুমানোর আগে ওযু, আয়াতুল কুরসি, তিন কুল এবং অন্যান্য প্রমাণিত জিকিরের সঙ্গে এই দোয়াটিও নিয়মিত আমল করা যেতে পারে।

ডান কাতে ঘুমানোর সুন্নত

ডান কাতে ঘুমানো রাসূলুল্লাহ (সা.)এর শেখানো গুরুত্বপূর্ণ ঘুমের আদবগুলোর একটি। হযরত আল-বারা ইবনু আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন-যখন সে বিছানায় যাবে তখন নামাজের ওজুর মতো অজু করে ডান কাতে শুয়ে নির্দিষ্ট দোয়া পড়তে। (সহীহ বুখারী: ২৪৭; সহীহ মুসলিম: ২৭১০) তাই ঘুমানোর শুরুতে ডানদিকে কাত হয়ে শোয়া সুন্নত হিসেবে পালন করা উত্তম।

ডান কাতে শোয়া শুধু একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়, এর সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নত অনুসরণ এর বিষয়টিও জড়িত। একজন মুসলিম ঘুমানোর আগে অজু করে ডান কাতে শুয়ে এবং আল্লাহর নাম ও দোয়া পাঠ করে রাতের বিশ্রাম শুরু করতে পারেন। তবে ঘুমের মধ্যে নিজের অজান্তে শরীরের অবস্থান পরিবর্তন হয়ে গেলে এতে কোন সমস্যা নেই কারণ মানুষের ঘুমের সময় নিজের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এই সুন্নতি নিয়মিত পালনের জন্য বিছানায় যাওয়ার পর প্রথমে ডান কাতে শোয়ার অভ্যাস তৈরি করা যেতে পারে। এরপর ঘুমের দোয়া ও অন্যান্য প্রমাণিত জিকির পাঠ করে শান্তভাবে ঘুমাতে যাওয়া যায়। এভাবে একজন মুসলিম দৈনিক জীবনের একটি স্বাভাবিক কাজ ঘুমের শুরুতেও রাসূলুল্লাহ সাঃ এর সুন্নত অনুসরণ করার সুযোগ পেতে পারেন।

উপুড় হয়ে ঘুমানো থেকে বিরত থাকা

উপর হয়ে ঘুমানো থেকে বিরত থাকা ইসলামের ঘুমের আদবের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম একজন ব্যক্তিকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন, "এ ধরনের শোয়া আল্লাহ পছন্দ করেন না।" এই বর্ণনাটি আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহসহ হাদিসের গ্রন্থে এসেছে। তাই অকারনে উপুড় হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস না করে সুন্নত অনুযায়ী ডান কাতে ঘুমানোর চেষ্টা করা উত্তম।

অনেক সময় মানুষ অভ্যাসবশত উপুড় হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে এবং বিষয়টি খেয়াল করে না। তাই এটিকে নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই বরং ঘুমাতে যাওয়ার সময় সচেতন ভাবে ডান কাতে শোয়ার চেষ্টা করাই মূল বিষয়। ঘুমের মধ্যে অনিচ্ছাকৃতভাবে শরীরের অবস্থান পরিবর্তন হয়ে গেলে সেটি মানুষের স্বাভাবিক বিষয় এবং এর জন্য নিজেকে দায়ী করার প্রয়োজন নেই।
ইসলামের ঘুমের আদবগুলো মেনে চলার ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম এর সুন্নত অনুসরণ করা এবং ঘুমানোর সময় ও আল্লাহর স্মরণে থাকা। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে ওযু করে, বিছানা ঝেড়ে, প্রয়োজনীয় দোয়া ও জিকির পাঠ করে ডান কাতে শুয়ে পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এতে ঘুমের মতো দৈনন্দিন একটি কাজও একজন মুসলিমের জন্য সুন্নত অনুসরণের সুন্দর সুযোগ হয়ে উঠতে পারে।

সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা

সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করা রাতে ঘুমানোর আগে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি আমল। এই দুই আয়াত সূরা বাকারার ২৮৫ ও ২৮৬ নম্বর আয়াত যা "আমানার রাসুলু" নামে পরিচিত। হযরত আবু মাসউদ আল-আনসারী (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করবে, তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।" (সহীহ বুখারী: ৫০০৯; সহীহ মুসলিম: ৮০৮)

এই দুই আয়াতে ঈমান, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং সাহায্য কামনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো রয়েছে। বিশেষ করে শেষ আয়াতে বান্দার দুর্বলতা, দায়িত্ব পালনের চেষ্টা এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও রহমতের আবেদন ফুটে উঠেছে। তাই ঘুমানোর আগে এই আয়াতগুলো পাঠ করা শুধু একটি আমল নয়, বরং নিজের ঈমান ও আল্লাহর উপর নির্ভরতার বিষয়গুলো স্মরণ করারও সুন্দর সুযোগ।

ঘুমানোর-আগে-সুন্নত-আমল-দোয়া-ও-ঘুমের-আদব


তাই রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে নিয়মিত সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করার অভ্যাস করা যেতে পারে। আয়াতগুলোর অর্থ বোঝার চেষ্টা করলে এর শিক্ষা হৃদয় ধারণ করা আরও সহজ হবে। অন্যান্য প্রমাণিত আমলের পাশাপাশি এই দুই আয়াত পাঠ করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা রহমত ও সাহায্য প্রার্থনা করে ঘুমাতে যাওয়া একজন মুসলিমের জন্য সুন্দর একটি রাতের আমল হতে পারে।

সূরা কাফিরুন পাঠ করার আমল

সূরা কাফিরুন পাঠ করা ঘুমানোর আগে করা যায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হযরত ফারওয়া ইবনু নওফাল (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন তিনি রাসূলুল্লাহ (স.) এর কাছে জিজ্ঞেস করেছিলেন ঘুমানোর আগে এমন কিছু পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কিনা। রাসূলুল্লাহ (স.) তাকে সূরা কাফিরুন পাঠ করা নির্দেশ দেন এবং বলেন এটি শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা হিসেবে রয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৫৫; জামে তিরমিজি: ৩৪০৩)

সূরা কাফিরুনে আল্লাহর এবাদতে একনিষ্ঠ থাকার এবং শিরক থেকে নিজেকে পৃথক রাখার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ঘুমানোর আগে এই সূরা পাঠ করার মাধ্যমে একজন মুসলিম নিজের বিশ্বাস ও তাওহীদের প্রতি অঙ্গীকারকে স্মরণ করতে পারেন। তাই শুধু মুখস্ত পাঠ নয়, সুরাটির অর্থ ও শিক্ষা বোঝার চেষ্টা করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘুমের আগে সুরা কাফিরুন পাঠ করতে চাইলে অন্যান্য প্রমাণিত সুন্নত আমলের পাশাপাশি এটি নিয়মিত পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। বিশেষ করে অজু করে ডান কাতে শুয়ে আয়াতুল কুরসি, তিন কুল ও অন্যান্য মাছ নুন দোয়া জিকিরের সঙ্গে এই সূরাটিও পাঠ করা যায়। তবে কোন আমলের ফজিলত বর্ণনা করার সময় নির্ভরযোগ্য হাদিসের উপর নির্ভর করা এবং দুর্বল বা ভিত্তিহীন অতিরিক্ত দাবি না করাই উত্তম।

ঘুমানোর আগে দরজা বন্ধ করার আদব

ঘুমানোর আগে দরজা বন্ধ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রাতের আদবগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে দরজা বন্ধ করার সময় আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, "তোমরা দরজা বন্ধ করো এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করো"। (সহীহ বুখারী: ৩৩০৪; সহিহ মুসলিম: ২০১২)

আপনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঘরের দরজা জানালা ভালোভাবে দেখে প্রয়োজনীয় দরজা বন্ধ করে নিতে পারেন এবং দরজা বন্ধ করার সময় বিসমিল্লাহ বলতে পারেন। এই সুন্নতের মধ্যে একদিকে আল্লাহকে স্মরণ করার শিক্ষা রয়েছে অন্যদিকে আপনার ঘর ও পরিবারের নিরাপত্তার প্রতিও সচেতন হওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে ঘরের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়া নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক।

আপনি যদি প্রতিদিন ঘুমানোর আগে ওযু করেন, বিছানা ঝেড়ে নেন, দরজা বন্ধ করেন এবং এরপর আয়াতুল কুরসি, তিন কুল ও মাসনুন দোয়া গুলো পাঠ করেন তাহলে রাতের প্রস্তুতিও সুন্দর একটি সুন্নত ভিত্তিক রুটিন এ পরিণত হতে পারে। এভাবে আপনার প্রতিদিনের স্বাভাবিক ঘুমের সময়টুকুতেও রাসুলুল্লাহ এর শেখানো আদক অনুসরণ করার সুযোগ তৈরি হবে। 




 


এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

jkumeducationit.com# নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Shamsunnahar Khatun
Shamsunnahar Khatun
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও জেকেইউএম এডুকেশন আইটি এর এডমিন। আমি ডিজিটাল মার্কেটিং, SEO, অনলাইন ইনকাম ও ব্লগিং বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। আমি নিয়মিত বাস্তব ভিত্তিক গাইড, টিপস এন্ড ট্রিকস ও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে নতুন তরুণদের অনলাইন জগতের প্রতি আগ্রহী করে যাচ্ছি। ।