ভিটামিন সি কেন খাবেন? উপকারিতা, উৎস ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

ভিটামিন সি কেন খাবেন? জেনে নিন ভিটামিন সি এর স্বাস্থ্য উপকারিতা, রোগ প্রতিরোধে ভিটামিন সি এর ভূমিকা, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের উৎস, দৈনিক চাহিদা, ঘাটতির লক্ষণ ও অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া।


ভিটামিন-সি-কেন-খাবেন-উপকারিতা-উৎস-ও-পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

ভিটামিন সি আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই প্রতিদিনের খাবার থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি গ্রহণ করা জরুরি। ভিটামিন সি কেন খাবেন, এর উপকারিতা, উৎস, দৈনিক চাহিদা ও অতিরিক্ত গ্রহণের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে সম্পূর্ণ পোস্টটি মনোযোগ সহকারে পড়ুন।

সূচিপত্রঃ ভিটামিন সি কেন খাবেন? উপকারিতা উৎস ও পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া

ভিটামিন সি কেন খাবেনঃ শরীরের জন্য এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা

ভিটামিন সি কেন খাবেন-এর প্রধান কারণ হলো এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন যা শরীর নিজে পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারে না। তাই প্রতিদিনের খাবার থেকেই ভিটামিন সি এর চাহিদা পূরণ করতে হয়। শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে এর প্রয়োজন রয়েছে এবং পর্যাপ্ত গ্রহণ না করলে পরবর্তীতে ভিটামিনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। 
ভিটামিন সি এর প্রয়োজনীয়তার গুরুত্বপূর্ন দিকগুলো হলো-
  • শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়তা করা।
  • উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে আয়রন শোষণের সাহায্য করা।
  • কোলাজেন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া।
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা।
  • শরীরের টিস্যু গঠন ও ক্ষত নিরাময়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা।
  • ত্বক, রক্তনালি, হাড় ও সংযোজক শিশুর স্বাভাবিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা।
তাই ভিটামিন সি শুধু কোন একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য নয় বরং শরীরের একাধিক স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। পেয়ারা আমলকি কমলালেবু কিউই পেঁপে ক্যাপসিকাম ও ব্রকলের মত খাবার খাদ্য তালিকা রাখলে ভিটামিন সি পাওয়া সহজ হয়।

ভিটামিন সি কী?

ভিটামিন সি এর রাসায়নিক নাম অ্যাসকরবিক অ্যাসিড(Ascorobic Acid)। এটি একটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন এবং শরীরের জমিয়ে রাখার ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নিয়মিত খাদ্য থেকে এর সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ফল ও সবজি ভিটামিন সি এর অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক উৎস। 

ভিটামিন সি এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যঃ 
  • এটি পানিতে দ্রবণীয় ভিটামিন।
  • শরীর নিজে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি তৈরি করতে পারেনা।
  • ফল ও সবজিতে প্রাকৃতিকভাবে ভিটামিন সি পাওয়া যায়।
  • শরীরে এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে।
  • কোলাজেন তৈরির জন্য এটি প্রয়োজনীয়।
  • উদ্ভিজ্জ খাবারের নন-হিম আয়রন শোষণের সাহায্য করে।
ভিটামিন সি এর ঘাটতি দীর্ঘদিন চলতে থাকলে স্কার্ভি হতে পারে। এর লক্ষণের মধ্যে ক্লান্তি, মাঠের সমস্যা, সহজে রক্তপাত বা কালশিটে পড়া এবং ক্ষত সারতে দেরি হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ভিটামিন সি এর প্রধান স্বাস্থ্য উপকারিতা

ভিটামিন সি শরীরের বিভিন্ন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখতে একাধিক উপায়ে কাজ করে। এর কোন একটি উপকারকে আলাদা করে দেখার পরিবর্তে সামগ্রিক পুষ্টির অংশ হিসেবে ভিটামিন সি এর ভূমিকা বিবেচনা করা উচিত। 

ভিটামিন সি এর প্রধান স্বাস্থ্য উপকার গুলো হলঃ
  • কোষের সুরক্ষাঃ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে ফ্রি রেডিক্যাল এর কারনে হওয়া অক্সিডেটিভ ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে।
  • আয়রন শোষণঃ উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা নন-হিম আয়রন শরীরে শোষণের সুবিধা বাড়ায়।
  • কোলাজেন উৎপাদনঃ শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে।
  • রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাঃ এমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যক্রম কে সমর্থন করে।
  • টিস্যু রক্ষণাবেক্ষণঃ ত্বক, রক্তনালি, হাড় ও সংযোজক টিস্যুর স্বাভাবিক গঠনে ভূমিকা রাখে।
  • ক্ষত নিরাময়ঃ ক্ষত সারানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে।
তবে এসব উপকার পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বেশিরভাগ মানুষের জন্য বৈচিত্র্যময় ও সুষম খাদ্য থেকেই পর্যাপ্ত ভিটামিন সি পাওয়া সম্ভব।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভিটামিন সি এর ভূমিকা

ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি বিভিন্ন ধরনের ইমিউন কোষের স্বাভাবিক কাজকে সমর্থন করে এবং এন্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কোষকে সুরক্ষায় সাহায্য করে।

রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভিটামিন সি এর ভূমিকাঃ
  • ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে সহায়তা করে।
  • বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী কোষের স্বাভাবিক কাজকে সমর্থন করে।
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে ইমিউন কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
  • শরীরে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি থাকা স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
  • ভিটামিন সি এর ঘাটতি হলে ইমিউন সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
ভিটামিন-সি-কেন-খাবেন-উপকারিতা-উৎস-ও-পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া


তবে এখানে একটি ভুল ধারণা এড়ানো জরুরী। বেশি পরিমাণ ভিটামিন সি খেলেই সর্দি কাশি বা সব ধরনের সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় না। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

ত্বক ও কোলাজেন তৈরিতে ভিটামিন সি এর উপকারিতা

ত্বককে শুধু সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে দেখলে ভিটামিন সি এর গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না। ত্বক শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ এবং এর স্বাভাবিক গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোলাজেন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রোটিন।কোলাজেন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভিটামিন সি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে।

ত্বকের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি এর ভূমিকাঃ
  • কোলাজেন তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে।
  • ত্বকের স্বাভাবিক গঠন ও দৃঢ়তা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  • ত্বকের স্বাভাবিক টিস্যু রক্ষণাবেক্ষণের সহায়তা করে।
  • ত্বকের সংযোজক টিস্যুর স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখে।
  • অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে ত্বকের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় সহায়তা করে।
  • ত্বকে ক্ষত তৈরি হলে স্বাভাবিক নিরাময় প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
তবে শুধু ভিটামিন সি খেলে ত্বক ফর্সা হয়ে যাবে বা সব ধরনের ত্বকের সমস্যা দূর হবে এমন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পন্ন দাবি করা ঠিক নয়। ত্বকের সুস্থতার জন্য সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান এবং সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ক্ষত সারাতে ও শরীরের টিস্যু গঠনে ভিটামিন সি এর ভূমিকা

শরীরে কোন ক্ষত তৈরি হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত করে নতুন টিস্যু তৈরীর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় কোলাজেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এবং কোলাজেন তৈরির জন্য প্রয়োজন ভিটামিন সি। তাই পর্যাপ্ত ভিটামিন সি শরীরের স্বাভাবিক ক্ষত নিরাময় প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।

ক্ষত ও টিস্যু গঠনের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি এর ভূমিকাঃ
  • ক্ষতনিরাময়ের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সহায়তা করে।
  • নতুন কোলাজেন তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
  • ত্বক ও অন্যান্য সংযোজক শিশুর স্বাভাবিক গঠন বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  • রক্তনালীর স্বাভাবিক গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণে ভূমিকা রাখে।
  • ক্ষতিগ্রস্ত টিসু মেরামতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।
দীর্ঘদিন ভিটামিন সি এর ঘাটতি থাকলে কোলাজেন তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং এর ফলে ক্ষত ভালো হতে দেরি হওয়া, মাড়ির সমস্যা ও সংযোজক টিস্যুর দুর্বলতার মত লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
তবে বড় ক্ষত, অস্ত্রোপচারের পরের ক্ষত বা দীর্ঘদিন ধরে কোন ক্ষত না শুকালে শুধু ভিটামিন সি গ্রহণের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এ ধরনের ক্ষেত্রে কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আয়রন শোষণে ভিটামিন সি কিভাবে সাহায্য করে

শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন থাকা রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে প্রয়োজন। তবে খাবারে থাকা সব ধরনের আয়রন শরীর সমানভাবে শোষণ করতে পারে না। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ খাবারে থাকা নন-হিম আয়রন শোষণে ভিটামিন সি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ভিটামিন সি মূলত খাবারের নন-হিম আয়রনকে এমন একটি রূপে পরিবর্তন করতে সাহায্য করে যা অন্ত্র থেকে শরীরে শোষিত হওয়া তুলনামূলক সহজ। ফলে ডাল, শাকসবজি, শস্য ও অন্যান্য উদ্ভিজ্জ খাবার থেকে পাওয়া আয়রনের ব্যবহারযোগ্যতা বাড়তে পারে।

আয়রন শোষণ বাড়ানোর সহজ উপায়ঃ
  • ডাল বা ছোলার সঙ্গে লেবুর রস যোগ করা।
  • পালং শাক বা অন্যান্য শাকের সঙ্গে টমেটো খাওয়া। 
  • আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে পেয়ারা, কমলা বা আমলকি খাওয়া।
  • খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সবজি যেমন ক্যাপসিকাম যোগ করা।
তবে ভিটামিন সি আয়রনের ঘাটতি বা রক্তস্বল্পতার সরাসরি চিকিৎসা নয়। কারো রক্তে আয়রনের ঘাটতি থাকলে শুধু ভিটামিন সি খাওয়ার পরিবর্তে কারণ নির্ণয় ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার ও প্রাকৃতিক উৎস

ভিটামিন সি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো প্রতিদিনের খাবারে বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি রাখা। বিশেষ করে টাটকা ফল ও কম সময় রান্না করা সবজি থেকে ভালো পরিমাণে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। কারণ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ বা অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে খাবারের ভিটামিন সি এর পরিমাণ কমে যেতে পারে।

ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলঃ
  • পেয়ারা
  • আমলকী
  • কমলা
  • মালটা
  • লেবু
  • কিউই
  • পেঁপে
  • স্ট্রবেরি
  • জাম্বুরা বা বাতাবি লেবু 
  • আনারস
  • আম ইত্যাদি।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সবজিঃ
  • ক্যাপসিকাম
  • ব্রকলি
  • টমেটো
  • বাঁধাকপি
  • ফুলকপি
  • কাঁচামরিচ
  • সজিনা পাতা
  • বিভিন্ন সবুজ শাকসবজি
খাবার বাছাইয়ের সময় শুধু একটি ফলের উপর নির্ভর না করে বিভিন্ন রং ও ধরনের ফল ও সবজি খাদ্য তালিকায় রাখা ভালো। এতে ভিটামিন সি এর পাশাপাশি ফাইবার, পটাশিয়াম ও ভিটামিন B9 (ফোলেট) ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায়।
আরেকটি বিষয় হলো ভিটামিন সি পাওয়ার জন্য সব সময় জুস তৈরি করার দরকার নেই। আস্ত ফল খাওয়া সাধারণত বেশি উপকারী কারণ এতে ফাইবারও পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত চিনিও যোগ করার প্রয়োজন হয় না।

কোন ফলে কতটুকু ভিটামিন সি রয়েছে

কোন ফলের কতটুকু ভিটামিন সে রয়েছে এ সম্পর্কে বলতে গেলে আমাদের প্রথমেই বলতে হয় ফলের ভিটামিন সি এর পরিমাণ ফলের জাত, পরিপক্কতা, সংরক্ষণ ও উৎপাদন পদ্ধতির ওপর কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই নিচের পরিমাণগুলোকে প্রতি 100 গ্রাম খাবারে আনুমানিক ভিটামিন সি হিসেবে দেখা উচিত।
ফলের নাম প্রতি ১০০ গ্রামে আনুমানিক ভিটামিন C
পেয়ারা প্রায় ২২৮ মিলিগ্রাম
আমলকী প্রায় ২৫০ - ৬০০ + মিলিগ্রাম
কিউই প্রায় ৯৩ মিলিগ্রাম
পেঁপে প্রায় ৬১ মিলিগ্রাম
স্ট্রবেরি প্রায় ৫৯ মিলিগ্রাম
কমলা প্রায় ৫৩ মিলিগ্রাম
লেবু প্রায় ৫৩ মিলিগ্রাম
মাল্টা প্রায় ৫০-৫৫ মিলিগ্রাম
আনারস প্রায় ৪৮ মিলিগ্রাম
আম প্রায় ৩৬ মিলিগ্রাম
জাম্বুরা বা বাতাবি লেবু                       প্রায় ৩১ মিলিগ্রাম

আমলকীর পরিমাণ উৎস ও জাতভেদে অনেকটা পরিবর্তিত হতে পারে, তাই নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা সব আমলকীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

সহজ ভাবে বুঝলে- পেয়ারা ও আমলকি ভিটামিন সি এর অত্যন্ত সমৃদ্ধ উৎস। অন্যদিকে কমলা, লেবু, কিউই, পেঁপে ও স্ট্রবেরিও নিয়মিত খাদ্য তালিকা রাখার মতো ভালো উৎস। তবে শুধু ভিটামিন সি এর পরিমাণ দেখেই ফল নির্বাচন করার দরকার নেই; ফলের ফাইবার, অন্যান্য ভিটামিন, খনিজ ও সামগ্রিক পুষ্টিগুণও বিবেচনা করা উচিত।

প্রতিদিন কতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন

প্রতিদিন কতটুকু ভিটামিন সি প্রয়োজন এই প্রশ্নের উত্তরে আমরা বলতে পারি ভিটামিন সি এর দৈনিক চাহিদা সবার জন্য সমান নয়। বয়স, লিঙ্গ এবং বিশেষ শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণ দৈনিক চাহিদা নিচে দেওয়া হলঃ

ব্যক্তি                     প্রতিদিন প্রয়োজন
প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ                             ৯০ মি.গ্রা.
প্রাপ্তবয়স্ক নারী                             ৭৫ মি.গ্রা.
গর্ভবতী নারী                             ৮৫ মি.গ্রা.
স্তন্যদানকারী নারী                             ১২০ মি.গ্রা.
ধুমপায়ী প্রাপ্তবয়স্ক             সাধারণ চাহিদার চেয়ে আরও ৩৫ মিলিগ্রাম বেশি

শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে বয়সভেদে চাহিদা আলাদা হয়। তাই তাদের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের নির্ধারিত পরিমাণ অনুসরণ করা উচিত নয়।
দৈনিক চাহিদা পূরণের জন্য সাধারণত বৈচিত্র্যময় খাবার যথেষ্ট হতে পারে। যেমন- একটি পেয়ারা বা ভিটামিন সি সমৃদ্ধ অন্য কোন ফলের সঙ্গে প্রতিদিনের সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখলে খাদ্য থেকে চাহিদা পূরণ করা সহজ হয়।
তবে চাহিদার চেয়ে বেশি ভিটামিন সি গ্রহণ করলেই অতিরিক্ত স্বাস্থ্য উপকার পাওয়া যাবে এমন নয়। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ভিটামিন সি এর ঘাটতি হলে কি কি সমস্যা হয়

শরীরে দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভিটামিন সি না থাকলে ধীরে ধীরে এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যারা পর্যাপ্ত ফল ও সবজি খান্না অত্যন্ত সীমিত খাদ্য তালিকা অনুসরণ করেন বা শরীরে পুষ্টির শ্বশুরের সমস্যা রয়েছে তাদের ঘাটতির ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

ভিটামিন সি এর ঘাটতিতে যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে-
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতাঃ স্বাভাবিক কাজকর্মেও অবসাদ অনুভূত হতে পারে।
  • মাড়ি থেকে রক্ত পড়াঃ মাড়ি ফুলে যাওয়া, সংবেদনশীল হওয়া বা সহজে রক্তপাত হতে পারে।
  • সহজে কালশিটে পড়াঃ সামান্য আঘাতেও ত্বকে নীলচে বা কালচে দাগ দেখা দিতে পারে।
  • ক্ষত সারতে দেরি হওয়াঃ শরীরের স্বাভাবিক কিছু মেরামতের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে।
  • ত্বকে পরিবর্তনঃ ত্বক শুষ্ক বা রুক্ষ হওয়া এবং ছোট ছোট লালচে দাগ দেখা দিতে পারে।
  • জয়েন্ট বা শরীরে ব্যথাঃ গুরুতর ঘাটতির ক্ষেত্রে পেশী ও জয়েন্টে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
  • রক্তস্বল্পতার ঝুঁকিঃ আয়রন শোষণে ভিটামিন সি এর ভূমিকার কারণে ঘাটতি থাকলে কিছু ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি ও প্রভাবিত হতে পারে।
  • চুল ও নখে পরিবর্তনঃ দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে চুল ও নখের স্বাভাবিক অবস্থায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
খুব বেশিদিন ও গুরুতর ভাবে ভিটামিন সি এর ঘাটতি থাকলে স্কার্ভি নামের রোগ হতে পারে। এর ফলে মাড়ির রক্তপাত, ক্ষত নিরাময়ে সমস্যা, দুর্বলতা ও সহজে কালশিটে পড়ার মতো লক্ষণ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। তাই দীর্ঘদিন এ ধরনের লক্ষণ থাকলে শুধু সাপ্লিমেন্ট না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

অতিরিক্ত ভিটামিন সি খেলে কী ধরনের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে

ভিটামিন C পানিতে দ্রবণীয় হওয়ায় অতিরিক্ত অংশের অনেকটাই শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে যত বেশি ভিটামিন C গ্রহণ করা হবে, তত বেশি উপকার পাওয়া যাবে। বিশেষ করে উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

অতিরিক্ত ভিটামিন C গ্রহণের সম্ভাব্য সমস্যা হলো-
  • ডায়রিয়া
  • বমি ভাব
  • পেট ব্যথা বা পেটে অস্বস্তি
  • পেটের খিচুনি
  • বুক জ্বালা বা হজমের সমস্যা
  • অতিরিক্ত মাত্রায় দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ভিটামিন সি এর সহনীয় সর্বত্র গ্রহণ মাত্রা হলো প্রতিদিন ২০০০ মিলিগ্রাম খাবার ও সাপ্লিমেন্ট মিলিয়ে। এটি দৈনিক প্রয়োজনীয় মাত্রা নয় বরং অতিরিক্ত গ্রহণ এড়ানোর একটি সীমা। 
তাই শুধু বেশি উপকার পাওয়ার আশায় ৫০০ বা ১০০০ মিলিগ্রাম ধরনের উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত নয়। স্বাভাবিক খাবার থেকে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হলে সেটিই অগ্রাধিকার দেওয়া ভালো। 

ভিটামিন সি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণে যেসব সতর্কতা জরুরী

প্রতিদিনের খাবার থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি পাওয়া গেলে সাধারণত আলাদা আলাদা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হয় না। তবে বিশেষ কোনো কারণে চিকিৎসক সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের পরামর্শ দিলে নির্ধারিত মাত্রা ও সময় মেনে তা গ্রহণ করা উচিত।
সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা গুলো হলোঃ
  • নিজের ইচ্ছায় উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট শুরু করবেন না।
  • খাবার থেকে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি পাওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয় supplement এড়িয়ে চলুন।
  • দীর্ঘদিন উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • যাদের কিডনিতে পাথরের ইতিহাস রয়েছে তারা বিশেষ সতর্ক থাকুন।
  • শরীরে আয়রন অতিরিক্ত জমার সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া উচ্চ মাত্রার ভিটামিন সি গ্রহণ করা উচিত নয়।
  • আপনি যদি নিয়মিত কোন ওষুধ গ্রহণ করেন সাপ্লিমেন্ট শুরু করার আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্ট কে জানান।
  • একাধিক মাল্টিভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট একসঙ্গে গ্রহণ করলে মোট ভিটামিন সি এর পরিমাণ হিসাব করুন।
  • শিশুদের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের শিশুদের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের উচ্চমাত্রার সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করবেন না।
  • পেটের সমস্যা দেখা দিলে সাপ্লিমেন্ট এর মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সাপ্লিমেন্ট কে খাবারের বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। বৈচিত্র্যময় ফল ও সবজি থেকে ভিটামিন সি গ্রহণের পাশাপাশি সামগ্রিক পুষ্টির দিকে নজর দেওয়াই ভালো।

শেষ কথাঃ ভিটামিন সি কেন খাবেন এবং কিভাবে সঠিকভাবে গ্রহণ করবেন

ভিটামিন সি কেন খাবেন-এখন পর্যন্ত আলোচনায় বিষয়টি পরিষ্কার যে এটি শুধু রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য নয়; কোলাজেন তৈরি, আয়রন শোষণ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সুরক্ষা এবং শরীরের টিস্যুর স্বাভাবিক রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীর নিজে পর্যাপ্ত ভিটামিন সি তৈরি করতে পারেনা বলে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকা থেকেই এর চাহিদা পূরণ করা দরকার। 
সঠিকভাবে ভিটামিন সি গ্রহণের জন্য-
  • প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ফল ও সবজি খাদ্য তালিকায় রাখুন।
  • পেয়ারা, আমলকি, কমলা, লেবু, পেপে, কিউই ইত্যাদি ফল নিয়মিত খাবারে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
  • আয়রন সমৃদ্ধ উদ্ভিজ্জ খাবারের সঙ্গে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার রাখলে আয়রন শোষণে সহায়তা পেতে পারেন।
  • ফলের জুসের পরিবর্তে সম্ভব হলে আস্ত ফল খান যাতে ফাইবারও পাওয়া যায়।
  • সবজি অতিরিক্ত সময় বা বেশি তাপে রান্না না করে উপযুক্ত পদ্ধতিতে রান্না করুন কারণ রান্না ও সংরক্ষণের সময় ভিটামিন সি এর কিছু অংশ নষ্ট হতে পারে।
  • শুধু বেশি ভিটামিন সি পাওয়ার জন্য অপ্রয়োজনীয় supplement গ্রহণ করবেন না।
  • ঘাটতির লক্ষণ, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা বা বিশেষ শারীরিক অবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সবশেষে মনে রাখা দরকার যে, সুস্থ থাকার জন্য শুধু একটি ভিটামিনের উপর নির্ভর করা যায় না। ভিটামিন সি এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ, ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন ও জরুরী। তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রাকৃতিক উৎস থেকে নিয়মিত ভিটামিন সি' রাখুন এবং প্রয়োজন ছাড়া উচ্চ মাত্রা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এড়িয়ে চলুন।

এতক্ষণ ধৈর্য সহকারে পোস্টটি পড়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। এরকম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন নতুন আপডেট পেতে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইটটি সাবস্ক্রাইব করে আমাদের পাশে থাকুন।  ভালো থাকুন, সুস্থ ও সুন্দর থাকুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

jkumeducationit.com# নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url

Shamsunnahar Khatun
Shamsunnahar Khatun
একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও জেকেইউএম এডুকেশন আইটি এর এডমিন। আমি ডিজিটাল মার্কেটিং, SEO, অনলাইন ইনকাম ও ব্লগিং বিষয় নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করি। আমি নিয়মিত বাস্তব ভিত্তিক গাইড, টিপস এন্ড ট্রিকস ও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে নতুন তরুণদের অনলাইন জগতের প্রতি আগ্রহী করে যাচ্ছি। ।